
আমাদের বাড়িটা ছিল সমুদ্রের কাছে।যেখানে আমার পুরো শৈশবটা কেটেছে। একটা ছোট্ট সুন্দর কটেজ। এত সুন্দর যা মানুষের মনে ইর্ষা জাগায়। বাড়ির চারপাশে, সবুজ ঘাসের মাঝে আকাশী রঙের বেড়া দেওয়া। উঠোনের একপাশে অর্কিড আর এস্ট্রিয়া ফুলের বাগান। জানলা দিয়ে ঝকমকে রোদের পাশাপাশি সমুদ্রের হাওয়াও আসে। পেছনে ঘন ঝাওবন। আমার মনে পড়ে স্কুল থেকে এসে কোনরকমে কয়েকটা ভাত খেয়ে দৌড়ে যেতাম সমুদ্রের ধারে। পুরো বিকেলটা কাটতো বন্ধুদের নিয়ে ধুলো-বালিতে গড়াগড়ি করে। খেলাধুলায় এত মত্ত থাকতাম যে ভুলে যেতাম সময়ের কথা। মা রাগ করতেন। মায়ের বকুনি খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। পড়তে পড়তে পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে যেতাম। বাবা রাতে অফিস থেকে এসে আমাকে ডেকে তুলতেন। আমরা একসাথে খেতে বসতাম।
বাবা মজার মজার গল্প করতেন। যদিও তিনি ভীষণ ব্যাস্ত থাকতেন তবুও তার ছোট্ট মেয়েটার জন্য তিনিই ঠিকই সময় বের করে নিতেন। তার ছিল ভীষণ ঘোরার নেশা। বনজঙ্গল তাকে খুব টানতো। মাঝে মাঝে আমি তার সঙ্গী হতাম। বাবাই আমাকে নক্ষত্র চেনা শিখিয়েছিলেন। তিনি শিখেছিলেন দাদুর কাছ থেকে।
নিস্তব্ধ রাত্রি। ওপরে নক্ষত্রখচিত বিশাল আকাশ। স্নিগ্ধ হাওয়া বয়ে যায়। তার ঝাপটা আমার চোখে-মুখে লাগে। সাথে স্মৃতি গুলো ফিরে আসে আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। এগুলো যে সব মিথ্যা। আসলে এতক্ষণ যা বললাম তা সব আমার মনের কল্পনা। কথায় আছে না -Reality is often disappointing. আসল ঘটনা শুনতে চাও? তাহলে শোন বলি।
আমার পুরো শৈশবটা কেটেছে এক নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে। বোঝার পর থেকে দেখতাম বাবা-মা একে ওপরের ওপর চিৎকার করছে। ঝগড়া সারাক্ষণ লেগেই থাকতো। তখন আমি আমার রুমে চুপ করে বই খুলে বসে থাকতাম। শুনতে না চাইলেও শুনতে পেতাম তারা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। বাবা -মাকে বলছেন “তোকে ছেড়ে দিব কিন্তু। ছেড়ে দিব।” এ কথাটা বাবা মাকে প্রায়ই বলতেন। একসময় সব সয়ে গেছিলো। শুধু মায়ের জন্য খারাপ লাগতো। প্রায় প্রায়ই দেখতাম মিটিং বসতো। দু-পক্ষের আত্মীয় স্বজন আসছে একটা সমাধান করতে। কিন্তু কখনোই আর সে সমাধান হতো না। স্বাভাবিক ভাবেই আমার কোন বন্ধু-বান্ধব ছিল না। আমাদের বাড়িটা ছিল বদ্ধ। বাড়ির গেটটাকে আমার মনে হতো বিশাল জেলখানায় গেটের মতো। মাঝে মাঝে সেই গেটটার ওপরে চড়ে দূরে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। দেখতাম আমার বয়সী ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি করতে। স্কুলেও আমি অদৃশ্য ছিলাম। যেতাম -আসতাম কেউ কখনো খেয়ালই করতো না। আমাকে কেউ পাত্তাই দিতো না। দিবে কিভাবে আমিতো কোন কিছুতেই ভালো ছিলাম না। খেলাধুলার কথা বাদই দিলাম ম্যাডাম পড়া ধরলে হা করে দাড়িয়ে থাকতাম সবসময়। সেজন্য একসময় আমার নাম হয়ে গেছিলো হা-করা। আমাদের ক্লাসে এক রোল ছিল এশার। মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম আমার যদি এক রোল হতো তবে নিশ্চয়ই ম্যাডামরা আমাকেও ওর মতো আদর করতো। এসব ভাবতে ভাবতেই ছুটির ঘন্টা পড়ে যেতো। মনে পড়ে একবার স্কুল থেকে পিকনিকে যাওয়ার কথা উঠলো। দুইশো টাকা ধরা হলো। আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করলো।আগে কখনো পিকনিকে যাইনি। বাসায় এসে সাহস করে বাবাকে কথাটা বললাম। যা হবার তাই হলো।
মা রান্নাঘরে রান্না করছিলেন। আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কত টাকা?
– দুইশ।
মা লুকিয়ে ব্যাগ থেকে দুইশ টাকা বের করে দিলেন। উত্তেজনায় সারারাত ঘুমোতে পারিনি। তবে না যাওয়াই বোধহয় ভালো ছিল। একে একে পিকনিকের দিন উপস্থিত হলো। অনেকে অভিভাবক নিয়ে এসেছে। সবাই কতো কতো রাইডে চড়লো। আমি শুধু ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। আমি যে এক্সট্রা কোন টাকা নিয়ে আসিনি। একজন জিজ্ঞেস করলো তুমি কোথাও চড়বা না? আমি বললাম না। আমার ভালো লাগে না বলে সরে আসলাম। মনে হলো ওরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। চোখে পানি আাসছিলো। ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি ধরেছিলাম। মনে হচ্ছিল যদি আমি এখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম।
এদিকে বাসায় এসে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। বাবা কোনভাবে জানতে পেরেছিলেন। ফলস্বরূপ আমার জন্য মাকে ভীষণ মার খেতে হয়েছে। মার ঠেকাতে আমি বাবার পা-দুটো জড়িয়ে ধরলাম। অনুরোধে করলাম বাবা আর মেরো না মাকে। বাবা ছেড়ে দিলেন। আমি মাকে ডাকলাম।
সেদিন তার চোখদুটো দেখে ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছিলাম। আসলে সেখানে ছিল শুধুই তিক্ততা আর রাগ। আমার প্রতি। একসময় দেখলাম আমার মা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেছে। তিনি সবাইকে ভালোবাসা ছেড়ে দিলেন। নিজেকেও। তাইতো তিনি একেবারের জন্য সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।৷ জীবন তো কারো জন্য থেমে থাকে না। আস্তে আস্তে সব সয়ে গেছিলো। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি হারিয়ে গেছি। আমার আত্মা কিছু চায়। কোন জায়গা? কোন মানুষ? যার কোন স্মৃতি আমার নেই।
এখন আমি বড়ো হয়ে গেছি। আসলে বড় তো সেই ছোট্ট বয়সেই হয়ে গেছিলাম। কাল চলে যাব এ শহর ছেড়ে একেবারের জন্য। সব শূন্য। কিছুই নেই। ফিরে তাকানোরও কিছু নেই। এখন বলতে পারো শুরুতে মিথ্যে কেন বললাম।
কেননা আমি কল্পনা করতে ভালোবাসি। সুন্দর সুন্দর কল্পনা করে দুঃস্বপ্নগুলো গিলে ফেলতে চেষ্টা করি।
লেখক: ইশরাত জাহান, মার্কেটিং বিভাগ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়